আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস
দেশে মানবাধিকার উন্নয়নের তাগিদ
আপলোড সময় :
১০-১২-২০২৪ ০৮:২৫:০২ অপরাহ্ন
নতুন দেশে ডেস্ক :
দেশে চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে হত্যা ও নির্যাতনের শিকার হওয়া মোট শিশুর সংখ্যা ১০৬২। আর বিভিন্নভাবে নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছেন ৬৬৯ জন নারী। একই সময়ে মব লিঞ্চিংয়ের (উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে বিচার) শিকার হয়েছেন ১০০ জন যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে হওয়া এসব ঘটনা যারা জাতির সামনে নিয়ে আসেন সেই সাংবাদিক শ্রেণির মধ্যে ৪৯৭ জন বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা উঠে এসেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে। এটিকে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষক আর মানবাধিকার কর্মীরা। তারা বলছেন দেশের মানবাধিকার রক্ষায় ঘুরে দাঁড়াতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেই। আর এমন অবস্থার মধ্যেই আজ ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস। ‘আমাদের অধিকার, আমাদের ভবিষ্যৎ, এখনই’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে এ বছর দিবসটি পালিত হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার রক্ষা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের এ দিনে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এ ঘোষণার মাধ্যমে স্বীকৃত হয় মানবাধিকার সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। এতে বলা হয় জন্মস্থান, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বিশ্বাস, অর্থনৈতিক অবস্থা কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বিশেষে মানবাধিকার সর্বজনীন ও সবার জন্য সমান। প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবেই এসব অধিকার লাভ করে। এই ঘোষণাপত্রের ৩০টি অনুচ্ছেদে প্রতিটি ব্যক্তির অধিকার ও রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্বের বিষয়টি সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ঘোষণাপত্র গ্রহণের দিন ১০ ডিসেম্বরকে প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার দিবস হিসেবে পালন করা হয়।
আসকের ওই প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম দশ মাসে শুধু হত্যার শিকার হয়েছে ৪৮২ শিশু। এর মধ্যে ১৩ থেকে ১৮ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ২৮০ জন এবং শূন্য থেকে ৬ বছর বয়সী ৮২ জন। আর নির্যাতনের শিকার শিশুর সংখ্যা ৫৮০। এ ছাড়া ওই সময়ে ৩৬৫ নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৫ জনকে।
বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, ওই সময়ে মব লিঞ্চিংয়ের (উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে বিচার) শিকার হয়েছে ১০০ জন। যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৩ সালে মব লিঞ্চিংয়ের শিকার জয়েছেন ৫১ জন, যা ২০২২ সালে ছিল ৩৬, ২০২১ সালে ২৮ জন এবং ২০২০ সালে ছিল ৩৫ জন।
মূলত যখন একজন ব্যক্তিকে অপরাধী বলে সন্দেহ করে একদল লোক ভিড়ের মধ্যে মারধর করে বা হত্যা করে সেটাকেই মব লিঞ্চিং বা মব জাস্টিস বলা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এ বছর মব লিঞ্চিংয়ের ঘটনা বেশি ঘটছে। এর কারণ হিসেবে তারা নানা ক্ষেত্রে সুবিধাবঞ্চিত থাকা, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব ও জমানো ক্ষোভসহ আরও অনেক কারণের কথা বলছেন। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে মব লিঞ্চিংয়ে মানুষ হত্যা, গণপিটুনি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুট, অনেকেই চাকরিহারা ও পদহারা হয়েছেন। যাকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বড় উদাহরণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘গত ১৫ বছরে রাজনৈতিক ও কর্মজীবনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষ সুবিধাবঞ্চিত ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। ফলে এ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে কষ্ট আছে, ক্ষোভও আছে। এসব কারণে কিছু মানুষ সংঘবদ্ধভাবে একত্রিত হয়ে যার বিরুদ্ধে ক্ষোভ তাকে হেনস্তা করছে। কাউকে চাকরিচ্যুত বা পদচ্যুত করছে, তো কাউকে কিছু না জেনেই অন্য মানুষের সঙ্গে মিলে মারতে মারতে মেরে ফেলছে। যা আইনের শাসনের পরিপন্থি। তাই যেকোনো সমস্যাকে আইনি প্রক্রিয়ায় সমাধান করাই সবার জন্য শ্রেয়। কারণ কেউ যদি তার সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের বিচার নিজেই করেন তবে সমাজে একটি অস্থির অবস্থা তৈরি হয়। তখন সুযোগসন্ধানী মহল এর সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে।’
মব লিঞ্চিং বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবসময়ই আমরা দেখে এসেছি সরকার পরিবর্তনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের এমন ঘটনা বেড়ে যায় তবে তা গ্রহণযোগ্য নয়। যারা এগুলো করছে তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও প্রতিশ্রুতিশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি এমন ঘটনা না ঘটানোর জন্য জনসাধারণকে সচেতন করতে হবে।
এ বিষয়ে মানবাধিকার কর্মী সুলতানা কামাল বলেন, আমি এটাকে মব জাস্টিস বলতে চাই না কারণ এটির সঙ্গে জাস্টিস কথাটি যুক্ত করলে আসলে জাস্টিস শব্দটির অবমাননা হয়। আমি এটাকে মব ভায়োলেন্স বলি। বর্তমানে এটির কারণে আমরা মানবাধিকারের দিক থেকে খুব খারাপ অবস্থায় আছি। এটা থামানোর জন্য আসলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক উন্নতি করতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা বাড়াতে হবে এবং আইন হাতে তুলে নেওয়া যে সমান অপরাধ সেটা মানুষকে বোঝাতে এবং সচেতন করতে হবে। আর যখনই এমন ঘটনা ঘটবে তখন তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ ও পদক্ষেপ নিতে হবে।
কমেন্ট বক্স