ঢাকা ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ , ১৫ ফাল্গুন ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

​‘মরে গেলেই ভালো হতো এত যন্ত্রণা পেতাম না’

আপলোড সময় : ১০-১২-২০২৪ ০৮:২০:২৯ অপরাহ্ন
​‘মরে গেলেই ভালো হতো এত যন্ত্রণা পেতাম না’ পেটে গুলিবিদ্ধ রবিউল ইসলাম।

নতুন দেশ ডেস্ক :

রবিউল ইসলাম (১৯) একজন কোরআনে হাফেজ। গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গিয়ে দিনাজপুর সদর জজকোর্টের গোল ঘরের সামনে পেটে গুলিবিদ্ধ হন। পুলিশের শটগান থেকে তার পেটে অসংখ্য ছররা গুলি লাগে। দিনাজপুর পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তর গোসাইপুর করিমপাড়া মহল্লার হতদরিদ্র শহিদুল ইসলামের একমাত্র ছেলে রবিউল।

রবিউল বলেন, ‘৫ আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিজের খরচে চিকিৎসা গ্রহণ করেছি। এরপর ৯ দিন বিভিন্ন রকমের টেস্ট, ওষুধে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা আমার জন্য অনেক ধার-দেনা করেছেন। এতেও আমার অবস্থার উন্নতি হয়নি।’

এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।  পেটের ভিতরে থাকা তিন শরও বেশি ছররা গুলির মধ্যে ৫০টা গুলি বিভিন্ন সময়ে অপারেশন করে বের করা হয়। রবিউল বলেছেন, ‘সেখানে প্রায় টানা ২৫ দিন চিকিৎসা গ্রহণ করার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে ১৫ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে দিনাজপুরে ফিরে আসি। ডাক্তার সেই সময় একটি মলম কিনে লাগাতে বলেছিলেন। দাম ১ হাজার টাকা। টাকার অভাবে সেই মলমটি পর্যন্ত কিনতে পারিনি। পেটের নাড়িভুঁড়িতে এখনো অসংখ্য গুলি লেগে আছে। এখনো মাঝে-মধ্যেই পেটের যন্ত্রণায় অস্থির লাগে। কোনো কাজ করতে পারি না। এমনকি অটোরিকশাও চালাতে পারি না।’ 

রবিউলের বৃদ্ধ বাবা তেমন কাজ করেন না। তাদের কোনো আয়-রোজগার নেই। রবিউল বলেছেন, ‘মাঝেমধ্যে মনে হয় সেদিন যদি মৃত্যুটা হয়ে যেত তাহলে হয়তো আজকের এই যন্ত্রণা সহ্য করতে হতো না। এ পর্যন্ত কেউ আর্থিক সহযোগিতা করেনি। এমনকি সরকারিভাবেও না। শুধু আশার বাণী আর আশার বাণী শুনতে হচ্ছে।’

রবিউলরা এক ভাই তিন বোন। তিনি সবার ছোট। তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। তাদের সংসারে টানাপোড়েন লেগেই থাকে। পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় তার বাবা খুব কষ্ট করে তাকে স্থানীয় এতিমখানার মাদ্রাসায় রেখে হাফিজিয়া পড়িয়েছেন। তিনি নিজেও একজন কোরআনে হাফেজ।’

রবিউল জানালেন, বাবার আর্থিক দুরবস্থা দেখে ভাড়ায় একটি অটোরিকশা চালিয়ে পরিবারকে সহযোগিতা করছিলেন। মায়ের কোমরের হাড় ক্ষয় যাওয়ায় মা তেমন চলাফেরা করতে পারেন না। অটো চালিয়ে মায়ের প্রতিদিনের ওষুধ কেনার দুই শ থেকে আড়াই শ টাকা জোগান দিতেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। রবিউলের কথায়, ‘এখন আমি নিজেই আহত হয়ে বাড়িতে পড়ে আছি। হাঁটাচলা করতে পারলেও আয় রোজগার নেই। অটোরিকশাও চালাতে পারছি না। নতুন বাংলাদেশ নতুনভাবে অর্জন করেছি। দেশের প্রয়োজনে এবার আমার জীবন উৎসর্গ করতে চাই। বর্তমান সরকার আমাদের আন্দোলনের ফসল। আমার কোনো কিছু হয়ে গেলে আফসোস নেই। তবে আমার পরিবারের পাশে যেন সরকার দাঁড়ায়।’ 

রবিউল বলেন, ‘আমার চিকিৎসার জন্য এ পর্যন্ত প্রায় চার-পাঁচ লাখ টাকা ঋণ হয়ে গেছে। পাওনাদাররা প্রতিনিয়ত বাড়িতে আসছেন। তাদের দেখলেই দুঃখ-যন্ত্রণায় চোখের পানি টপটপ করে পড়তে থাকে। মনে হয় তাদের পাওনাটা শোধ করতে না পারলে আমি কবরে গিয়েও শান্তি পাব না।’ 

রবিউল ইসলামের মা লাইলী বেগম বলেন, ‘প্রতিদিনের মতো আমিও বাড়ির পাশেই একটি আলুর কোল্ডস্টোরে কাজ করি। ছেলে ৪ আগস্ট সকালে অটোরিকশা নিয়ে বের হয়েছিল। দুপুরে আমি খবর পাই আমার ছেলে আন্দোলনে গেছে। পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। এই খবরটি শোনার পর দৌড়াচ্ছি আর দৌড়াচ্ছি, ছেলের লাশ দেখার জন্য। দৌড়ে দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে গেছি। হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের সামনে দেখি আমার ছেলে কাতরাচ্ছে। রক্তে শরীর ভেসে যাচ্ছে। চিৎকার করেছি আর বলেছি আমার ছেলেকে বাঁচাও। আমি ছেলের জীবনটা ভিক্ষা চাই, আল্লাহ। আমি নিজে অসুস্থ। ছেলেকে চিকিৎসা করাব কী করে? সকালে খেলে দুপুরের খাবারের জন্য চিন্তা করতে হয় আমাদের। আর দুপুরে খেলে রাতে মাঝেমধ্যে এখনো না খেয়ে থাকতে হয়। সরকার যদি মুখ তুলে চাইত আমরা বাঁইচা যাইতাম।’


কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ